ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে রামশরণ শর্মার মতামত সংক্ষেপে ব্যক্ত করো
ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে রামশরণ শর্মার মতামত সংক্ষেপে ব্যক্ত করো।
ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশে রামশরণ শর্মার মতামত ।
- ভূমিকা :
- ঐতিহাসিক রামশরণ শৰ্মা (Ram Sharan Sharma) তাঁর প্রখ্যাত 'ফিউডালিজম' (Feudalism) গ্রন্থে ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব এবং বিকাশ সম্বন্ধে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। পাল, প্রতিহার এবং রাষ্ট্রকূট রাজ্যে সামন্ত ব্যবস্থার বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। অগ্রহার ব্যবস্থার অন্তর্গত ব্রাক্ষ্মণ সম্প্রদায় এবং মন্দির ও মঠগুলি নিষ্কর ভূমি দানের সুযোগসুবিধা ভোগ করত। কৃষকদের অবস্থার অবনমন ঘটেছিল। স্বাধীন কৃষকের পর্যায় থেকে তারা বদ্ধহল এবং আশ্রিতহালিকে পরিণত হয়েছিল।
ভারতবর্ষে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশে রামশরণ শর্মার মতামত :
মধ্যযুগের ইউরোপের ভূমিদাসদের (Serf) সঙ্গে এদের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। কৃষকরা নানাপ্রকার কর এবং বেগার শ্রম দিতে বাধ্য থাকত। ঐতিহাসিক কোসাম্বী দেখিয়েছেন যে, অনেক সময় কর ব্যবস্থার চাপ সহ্য করতে না-পেরে কৃষকরা অন্যত্র চলে যেত। এই ভূমিকেন্দ্রিক বা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রাধান্যের ফলে দূর-বাণিজ্য (Long Distance Trade) প্রভাবিত হয় এবং নগরায়ণের প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে আসে। অধুনা বিখ্যাত নগরগুলি যেমন—কোসাধী, শ্রাবত্তি, বৈশালী ইত্যাদি পূর্বের মতো আর সমৃদ্ধশালী ছিল না। বাণিজ্যের অভাবে মুদ্রা ব্যবস্থা অপ্রতুল হয়ে আসে।
শর্মার দ্বারা ভারতীয় অর্থনীতির এই শোচনীয় অবস্থার ব্যাখ্যার সঙ্গে ঐতিহাসিক হেনরি পিরেনের (Henry Pirenne) মধ্যযুগীয় ইউরোপের আর্থসামাজিক দুর্দশার ব্যাখ্যার অদ্ভুত রকমের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। পিরেনের মতে, ইসলামের উত্থান এবং তার সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য (Mediterranean Trade) ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইউরোপ একটি বন্ধ অর্থনীতিতে (Economy of No Outlets) পরিণত হয়।
স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার বিকাশ ঘটে এবং সামন্ত ব্যবস্থার উদ্ভব হয়। গ্রামভিত্তিক কৃষি অর্থনীতি ইউরোপের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। শর্মার সঙ্গে আরও কয়েকজন ঐতিহাসিক যথাক্রমে ডি এন ঝা (D N Jha) এবং বি এন এস যাদব (BN S Yadav ) প্রায় একই বক্তব্য রাখেন এবং ভারতের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থবির চিত্রটি তুলে ধরেন। এদের বক্তব্য অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট সামন্তপ্রভুরা কৃষকদের ভূমিদাসদের ন্যায় শোষণ ও নির্যাতন করতেন এবং সামাজিক উদ্বৃত্ত আহরণ করে নিজেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন।
হিন্দু মন্দির এবং বৌদ্ধ ও জৈনদের মঠগুলি প্রচুর জমিজমার অধিকারী ছিল এবং তাদের ভরণ-পোষণের জন্য কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। জাপানি ঐতিহাসিক নোবুর কারাশিমা (Noburu Karashima) চোল শাসনব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, চোল সামন্তপ্রভুরা গ্রামাঞ্চলে জমি ক্রয় করে ভূস্বামী হয়ে গিয়েছিলেন।
Comments
Post a Comment
If you have any Questions, please let us know in the comments below.