StudyMamu

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন কাকে বলে

April 23, 2023

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বলতে কী বোঝ? / জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন কাকে বলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবী দুটি পরস্পর বিরোধী জোটে বিভক্ত হয়েছিল একদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানী, ইত্যাদি পুঁজিবাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্রসমূহ যাকে প্রথম বিশ্ব নামে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং অন্যদিকে ছিল সোভিয়েত রাশিয়া এবং পূর্ব ইওরোপের দেশসমূহ নিয়ে গঠিত সমাজতান্ত্রিক আদর্শে ও পরিকাঠামোয় বিশ্বাসী ব্লক যাকে বলা হত দ্বিতীয় বিশ্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধান্তে এই দুই পরস্পরবিরিধী রাষ্ট্রজোট নিজেদের মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং দ্বন্দ্বের পরিবেশ তৈরী করেছিল এবং বিশ্ব জুড়ে নিজ নিজ জোটের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে তৈরী করেছিল এমন এক টেনশনের পরিস্থিতি যাকে ঠান্ডা যুদ্ধ নামে অভিহিত করা হয়।

প্রায় সমসাময়িক পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছিল এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্য আমেরিকায় উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, মরক্কো, কঙ্গো, জাইরে, জিম্বাবোয়ে, সিরিয়া, ওয়েস্ট, ইন্ডিজ, ঘানা, কেনিয়া, উগান্ডা প্রভৃতি দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদী শাসনের হাত থেকে মুক্তি লাভ করে ও স্বাধীন হয়ে ওঠে। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বহু দেশ এবং আর্থিক দিক দিয়ে পশ্চাদপদ মধ্য প্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার দেশসমূহ সাধারণভাবে তৃতীয় বিশ্ব নামে আত্মপ্রকাশ করে।

দ্বিমেরু বিশ্বের জোট রাজনীতি এবং তৎজনিত ঠান্ডা যুদ্ধের পরিবেশ থেকে তৃতীয় বিশ্বভুক্ত দেশগুলি দূরে থাকতে চেয়েছিল ঐ দেশগুলির অধিকাংশেরই সাধারণ লক্ষ্য ছিল আভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহাবস্থান, সহযোগিতা এবং আদানপ্রদান এই লক্ষ্যে তারা দুই জোটের কোনটারই অন্তর্ভুক্ত না হয়ে একটি মৌলিক বিদেশনীতি গ্রহণ করেছিল যাকে জোট নিরপেক্ষতার নীতি বলা হয়। 

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং তাঁর সহযোগী ভি কে কৃষ্ণমেননের চিন্তাধারা থেকে এই জোট নিরপেক্ষ নীতির উদ্ভব ঘটেছিল এবং পরবর্তীকালে তৃতীয় বিশ্বভুক্ত ইন্দোনেশয়া, ঘানা, যুগোশ্লাভিয়া প্রভৃতি দেশের অংশগ্রহণে এই নীতি যুদ্ধপরবর্তী বিশ্বে একটি শক্তিশালী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে যা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন নামে পরিচিত।

জে ডব্লু বার্টন বলেছেন যে জোট নিরপেক্ষতা বলতে সেই সকল দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বোঝায় যারা বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া এবং মার্কিনী পশ্চিমী জোটের কোনটাতেই যোগদান করেনি। 

অন্যদিকে পার্থ চট্টোপাধ্যায় অন্যভাবে জোট নিরপেক্ষতাকে সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন যে তৃতীয় বিশ্বভুক্ত দেশগুলির সামাজিক রূপান্তরের পর্বে জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির অর্থ জাতীয় প্রেক্ষিতে আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীনতার চেতনা। 

মার্কিন সচিব ফস্টার ডালেস জোট নিরপেক্ষতার নীতিকে অনৈতিক নিরপক্ষেতা বলে শ্লেষ করেছেন। তবে ফস্টার ডালেসের অনৈতিক নিরপেক্ষতার তত্ত্ব গ্রহণযোগ্য নয় কারণ জোট নিরপক্ষেতা কোন নেতিবাচক নিরপেক্ষ আন্দোলন বা নীতি ছিলনা। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কোন পক্ষ অবলম্বন না করাকে নিরপেক্ষতা বলে এই নিরপেক্ষতায় আত্মকেন্দ্রিকতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিস্পৃহতা প্রকাশ পায়, কিন্তু জোট নিরপেক্ষতায় আন্তর্জাতিক সমস্যা, সংকট বা সংঘাতকে বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ করে স্বাধীন মত ব্যক্ত করা হয়।

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে পরিপন্থী একটি নীতি যা সামরিক অস্ত্রশস্ত্র সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা এবং সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিরোধী।

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে শরিক দেশগুলি আসলে কোন জোট গঠন করবেনা বা নিঃসঙ্গ থাকবেনা, শুধু বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখবে। 

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি ও সংহতির পরিবেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি জোট নিরপেক্ষতার লক্ষ্য হবে সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্যর বিরোধিতা করা এবং অন্যদিকে মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে রক্ষা করা। 

বিশ্বে দারিদ্র্য, অনগ্রসরতা, শ্রেণীবৈষম্য ইত্যাদির কারণে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে দ্বন্দ্ব ঘটে জোট নিরপেক্ষতার লক্ষ্য – হবে – বৈষম্য ও অনগ্রসরতা দূর করা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ন্যায়ের ভিত্তিতে স্থাপন করা। কার্যতই জোট নিরপেক্ষতা কোন নেতিবাচক আন্দোলন বা নীতি নয়। – এটি চরিত্রগত দিক দিয়ে গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি। ১৯৫৪ সালে জওহারলাল নেহেরু যুগোশ্লাভিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মার্শাল টিটোর সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন যে জোট নিরপেক্ষ একটি সক্রিয়, ইতিবাচক ও গঠনমূলক নীতি।

Share Post :

Leave a Comment