দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর

মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি শুধু একজন দক্ষ সামরিক নেতা নন, বরং একজন বিচক্ষণ প্রশাসক ও দূরদর্শী শাসক ছিলেন। মুহাম্মদ ঘোরীর মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে মুসলিম শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন বিশ্লেষণ করা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।
কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন
১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে মইজুদ্দিনের অকস্মৎ মৃত্যু তার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্যা অমীমাংসিত রেখে যাওয়াই ভারতবর্ষে মামেলুক বংশীয় তুর্কিরা সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে মইজুদ্দিনের অন্যতম ক্রীতদাস কুতুবউদ্দিন আইবকের প্রতি প্রয়াত সুলতানের প্রীতি ও বিশ্বাসের কথা রাজ্যের গণ্যমান্যদের অজ্ঞতা ছিল না। সুতরাং, লাহোরের প্রভাতশালী অভিজাতরা ১২০৬ সালে কুতুবউদ্দিনকেই সুলতান হিসেবে মনোনীত করেন। এর তিন বছর পর ঘুর এর শাসক গিয়াসউদ্দিন এর অনুমোদন লাভের পর তিনি রীতি সম্বত ভাবে সুলতানের পদে ব্রীত হন। সুলতান হওয়ার আগে কুতুবউদ্দিন মালিক ও সিপাহ শালার হিসেবে মূল্যবান প্রশাসনিক ও সামরিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন।
মইজুদ্দিনের মৃত্যুর পর ভারতে তুর্কি অধিকিত স্থানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও তার সুসংহত ছিল না। এছাড়া ইলদিজ ও কুবাচার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কুতুবউদ্দিনের সামনেও সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। এদের মধ্যে ইলদিজ গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ কর্তৃক গজনীর শাসক মনোনীত হবার পর পাঞ্জাব অধিকার করার উদ্যোগ করেন। কিন্তু কুতুবউদ্দিনের কাছে পরাজিত হওয়ায় তিনি বুহিস্থানের দিকে পালিয়ে যান। বিজয়ী কুতুবউদ্দিন বিনা বাধায় গজনীতে উপনীত হন এবং তা দখল করেন। শিশু সুলতানি রাষ্ট্রের একটি বিপদ এরকম ভাবেই অতিক্রম করেন কুতুবউদ্দিন। তবে এই সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী কেননা ইলদিজ কিছুকালের মধ্যে ফিরে এসে নিজের রাজ্য আবার দখল করেন। পরাজিত কুতুবউদ্দিন পাঞ্জাব ফিরে এসে সীমান্ত রক্ষার জন্য লাহোরের তার রাজধানী স্থাপন করেন। এর কিছু পরে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ এক দুর্ঘটনায় তার জীবনাবাসন হয়।
কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন ভারতবর্ষে সদ্য বিজিত তুর্কি সাম্রাজ্যের ওপর স্থায়ী হলেও তিনি সুলতানি কৃতিত্বের স্মরণীয় হয়ে আছেন। তার মধ্যে রণকুশলতা ও সাহসিকতার সঙ্গে মিশে ছিল পারর্শিকদের সূক্ষ্ম রন্টি ও বদান্যতা। শেষোক্ত গুণের জন্য তিনি ‘লাখ বক্স’ (Lakh Baksh) বা ‘লক্ষ দাতা’ নামে পরিচিত ছিলেন। দিল্লি ও আজমিরের তার তৈরি মসজিদ দুটি স্থাপত্য শিল্পে তার আগ্রহ প্রমাণিত করে। ক্ষমতা লাভের আগে তার উদ্যম এবং সক্রিয় সাহায্যই মইজুদ্দিনকে উত্তর ভারতে সাময়িক সাফল্য গুলি অর্জন করতে সাহায্য করেছিল।

অবশ্য কুতুবউদ্দিন এর ব্যর্থতা কম ছিল না আফগানিস্তানের তার সাময়িক অভিযানে অসাফল্য ছাড়াও উত্তর ভারতের সমস্ত তুর্কি শাসনাধীন অঞ্চলে তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিষ্ঠান করতে পারেননি। বিহার ও বাংলা নিজ কর ও লাগত করে বখতিয়ার খিলজী ও কুতুবউদ্দিনের কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন। তার সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালের প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত আছে এই সময়েই আফগানিস্তানের তুর্কি কর্তৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতবর্ষে এক স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মুসলমান রাজ্য গড়ে ওঠে। ১৫২৬ সালের বাবর কর্তৃক সাম্রাজ্য স্থাপনের আগে ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কিন্তু শুধুমাত্র এ কারণে কুতুবউদ্দিন কে দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সম্মান দেওয়া যায় না। কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায়, চতুর্দশ শতকে ইবন বতুতা নামে আফ্রিকার যে পর্যটক ভারতবর্ষে এসেছিলেন তিনিও তার এই মর্যাদা দেননি। কুতুবউদ্দিন নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন কিনা অথবা তার নামে খুৎবা পড়া হত কিনা তার নিশ্চিত ভাবে বলা কঠিন। খুৎবায় যে সমস্ত তুর্কি শাসকদের নাম পরবর্তীকালে ফিরোজ শাহ তুঘলক অন্তভুক্ত করেছিলেন তার মধ্যে ও কুতুবউদ্দিন অনুল্লিখিত। তাছাড়া মধ্যযুগে মুসলমান জনমতের বিচারে বাগদাদের খালিফা কর্তৃক সুলতান হিসেবে স্বীকৃত হওয়া সার্বভৌম ক্ষমতা প্রাপ্তির প্রধান শর্ত বলে বিবেচিত হন। কিন্তু কুতুবউদ্দিন সেই সৌভাগ্য হয়নি।
উপরোক্ত দিল্লি নয় লাহোর-ই ছিল তার রাজধানী শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। সাময়িক কুশলতায় বিশিষ্ট হলেও কুতুবউদ্দিন কোন সৃজনশীল প্রতিভা স্বাক্ষরেখে যেতে পারেননি। কোন প্রশাসনিক সংস্কার বা সামাজিক সংহতি অর্জনের রূপরেখা বা পরিকল্পনা প্রকাশের তার অবকাশও হয়নি। প্রকৃতপক্ষে গজনীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং হিন্দুস্তানের উপর গজনীর সার্বভৌমত্ব দাবির অবসান ঘটানো ছাড়া কুতুবউদ্দিন এর কোন স্থায়ী অবদান ছিল না। ১২০৬-১২১০ সালের মধ্যে ভারতবর্ষে সদ্য স্থাপিত তুর্কি সাম্রাজ্য কে আত্মস্থ হবার জন্য কুতুবউদ্দিনের নেতৃত্ব সংগ্রাম করতে দেখা গিয়েছিল মাত্র পুণ্য সাফল্য তখনো পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।
কুতুবউদ্দিন এর আকস্মিক মৃত্যুর পর রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু আবার লাহোর থেকে দিল্লিতে ফিরে আসে। লাহোরের অভিজাতরা আরাম শাহ নামক জৈনক স্বল্প পরিচিত কে তুর্কি শাসক হিসেবে মনোনীত করলেও তা সফল হয়নি কয়েক মাসের মধ্যে বদায়ুনের শাসকতা ইলতুৎমিস দিল্লির আমির ওমরাহদের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে যুব এর রণক্ষেত্রে আরাম শাহ কে পরাজিত করে দিল্লির মসনদ দখল করেন।
কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, তিনি শুধু দিল্লি সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর সামরিক দক্ষতা, প্রশাসনিক ভিত্তি গঠন এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিল্লি সালতানাতকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে। মুহাম্মদ ঘোরীর মৃত্যুর পর স্বাধীন শাসক হিসেবে তিনি যে দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের পরিচয় দেন, তা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাই ইতিহাসের আলোচনায় কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তাঁর অবদান দিল্লি সালতানাতের স্থায়িত্ব ও বিস্তারের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। যদিও তাঁর শাসনকাল দীর্ঘ ছিল না, তবুও তিনি যে শক্ত ভিত্তি গড়ে দেন, তার ওপর দাঁড়িয়েই দিল্লি সালতানাত পরবর্তী সময়ে আরও সুসংগঠিত হয়।